জঙ্গিবাদ নির্মূলে ফের বাঙালীর শেকড়ের সন্ধানের তাগাদা দিচ্ছেন দেশের “প্রগতিশীলরা”। বলছেন বাঙালী সংস্কৃতির জাগরণ ঘটাতে হবে। বাঙালীকে আবার তার নিজস্ব শেকড়ে নিয়ে যেতে হবে। নাট্যজন, সংস্কৃতিজন, সাহিত্যিক-কবিরা র্যােলি করেছেন, মানববন্ধন করছেন, তারা বলেছেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিজেদের বাঙালী জাতিসত্ত্বার উপদানগুলি ফের জাগাতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে বাঙালী শেকড়টা কোথায়? একজন বাংলাদেশীর বয়স সর্বচ্চ ৪৪ বছর কিন্তু বাঙালী তো হাজার বছরের একটা দীর্ঘ ভ্রমণ! আপনি কি সেই দীর্ঘ ভ্রমণে যেতে ইচ্ছুক?
বাঙালী মুসলমান তথা বাংলাদেশী বাঙালীরা মনে করে ১৭৫৭ সালে তাদের স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে হরণ হয়ে তারপর দীর্ঘ দুইশো বছরের গোলামী তাদেরকে করতে হয়েছিল। তাদের স্বাধীন নবাব সিরাজকে (মানুষ যাকে লম্পট, মদ্যপ্য, চরিত্রহীন বলে ভয় পেতো) চক্রান্ত করে (সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র!) পরাজিত করে “বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে অস্তমিত করে দেয়”! বিস্ময়কর!! আমি আজো বুঝি না কি করে বাঙালী ১৭৫৭ সালে পরাধীন হয়েছিল? কি করেই বা তার আগে স্বাধীন ছিল? বাঙালীর নিজের কোন শাসক যদি থাকে তো খোঁজ করলে সে কোন হিন্দু রাজাই হবে। সে অর্থে সে কালে স্বাধীন বা পরাধীন বলতে কিছু নেই সাধারণ প্রজাদের। যেটা ছিল বিদেশী শাসক আর দেশী শাসক। কার্যত সবাই ছিল নির্মম শোষক। কিন্তু আরব বংশোদ্ভূত নবাব আলীবর্দী খাঁ, যারা মা ছিলেন তূর্কি উপজাতি তার নাতি সিরাজদৌলা বাঙালীর ‘স্বাধীন’ নবাব ছিলেন, যিনি পরাজিত হওয়ায় বাঙালী দুশো বছর গোলামী করেছিল পরাধীনতার- কি করে সম্ভব!... সুলতান মাহমুদের মত হানাদারদের এদেশের মুসণমানরা নিজেদের গর্বিত পূর্বপুরুষ বলে মনে করে। বখতিয়ারের ঘোড়া নাকি বাংলায় স্বৈরশাসক রাজাকে পরাজিত করে ইসলামের সুমহান সাম্য ছড়িয়েছিল। এহেন ‘প্রগতিশীল ইতিহাস” এতকাল প্রসার করে আজ কোন শেকড়ের সন্ধানের ডাক দিচ্ছেন বৃদ্ধ প্রগতিশীলরা?
সচেতনভাবেই বাংলাদেশীরা একটি ভিন্ন কেলেন্ডার ব্যবহার করে পহেলা বৈশাখ পালন করে। এর মাধ্যমে স্পষ্টত বাংলাদেশী বাঙালী মুসলমান তার প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুর সঙ্গে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। যেহেতু বাঙালী হিন্দুর পুজা-পার্বন নতুন কেলেন্ডারে পালন করা সম্ভব না। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের সঙ্গে সংস্কৃতি ভিন্নতা আরোপিত করেছে এর মাধ্যমে। বাঙালীর একমাত্র বৃহৎ সেক্যুলার উৎসব বৈশাখকে স্পষ্টত হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করা হয়েছে এবং এর জন্য দায়ী বাংলাদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরেই। বাংলাদেশী সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যের লেখকদের মুসলমান ও অসুলমান এই দুই ভাগে বিভক্ত করে ইতিহাস রচনা করেছে।
এই কাজটি করেছেন এদেশের প্রগতিশীল বলে দাবীদার লেখক-সাহিত্যিকরেই। পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই অংশ মিলে যে বৃহৎ অবিভক্ত বাংলা ছিল, তার যে সাহিত্য, সেটাকে তো খুব সহজেই “পূর্ব বাংলার সাহিত্যিক” আর “পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক” বলে উল্লেখ করা যেতো। কোন অসুবিধা ছিল না। “বাঙালী হিন্দু সাহিত্যিক বলতে তো কিছু নেই! যে দেশে “মুসলমানিত্ব” পরিচয়টি এত বড় হয়ে দেখা দেয় কবি-সাহিত্যিকদের মত মানুষদের কাছে, যারা জনগণকে উদার ও অসাম্প্রদায়িক হতে শেখাবেন, প্রগতিশীলতা ছড়াবেন- সে দেশে যে ছেলের ঘরে ফের বাবার জন্ম হবে এ আর আশ্চর্য কি? হাতমে বিড়ি মুখমে পান লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ গাওয়া পিতার ঘরে জন্মেছিল এইসব ‘মুসলমান প্রগতিশীল” পুত্ররাই। সেই পুত্রের ঘরেই আবার জন্মেছিল বাবা- অর্থ্যাৎ সেই দ্বিজাতি তত্ত্ব। জঙ্গিবাদ তো মুসলমানিত্বের উপরই জেগে উঠেছে। যে বাঙালীত্বের কথা এখন বলা হচ্ছে সেখানে কি “বাঙালী মুসলমান” এইরকম করে পৌঁছানো যাবে?

No comments:
Post a Comment