ব্রিটিশ শাসিত ভারতে মুসলমানরা ‘খেলাফত আন্দোলনের’ ডাক দিয়েছিল তুরষ্কের খলিফার খিলাফত রক্ষা করতে! ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিরোধী আন্দোলনে আলেম-ওলামাদের ভূমিকা কিংবা মুসলমানদের ভূমিকা জাতীয় বিকৃত অর্ধসত্য ইতিহাস আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। আসলে এরা মধ্যযুগীয় ইসলামী শাসনের শেষ খলিফার সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তো, কি ছিল এর উদ্দেশ্য?
ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খিলাফত আন্দোলনের এক বৈঠকে খেলাফত আন্দোলনের নেতারা বলেন, “খেলাফত আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপরে চালানোর জন্য সংগঠিত করা এবং দুনিয়াতে আল্লাহ্'র কালামকে বুলন্দ করা। এর জন্য জরুরী হচ্ছে খলীফার হাতে যথাযথ কর্তৃত্ব থাকা। খলীফা বিহীন জীবনই হচ্ছে ইসলাম বিহীন জীবন। খিলাফত বিহনে বসবাস করলে মুসলমানদেরকে আখেরাতে জবাব দিতে হবে…”।
খেলাফত আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি ছিল বক্তাদের কথা থেকে এখানে পরিষ্কার। অবিভক্ত ভারতবর্ষে রাজনীতি সচেতন মুসলিমরা মনের ভেতর এইরকম সাম্প্রদায়িক বিভাজনই পুষে রাখতেন। তিতুমীর, শরিয়তউল্লাহ তাদের বাঁশের কেল্লায় ইসলামী খেলাফতই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যে খিলাফত মুসলমানদের স্বরাজ। বাকীরা সেখানে জিজিয়া কর দিয়ে নতমস্তকে বসবাস করবে। মুসলিম নেতারা ছিলেন ইংরেজদের তাবেদার।
প্রথম বিশ্বেযুদ্ধে ইংরেজদের এরা সমর্থন জানিয়েছিল কিন্তু যখনই যুদ্ধ শেষে তুরষ্কের খেলাফতকে বিলুপ্ত করতে যাচ্ছিল তখনই তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ সফল করতে ইংরেজরা মুসলমান নেতাদের ঘুষের বিনিময়ে তাদের পাশে নেয়। ঢাকার নবাবকে মোটা অর্থ দিয়ে বঙ্গভঙ্গ সফল করা হয়। এরাই ১৯১৯ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে খেলাফত আন্দোলন শুরু করে। এ যেন আফগানস্থানে আমেরিকার তালেবানদের সহায়তা করা এবং পরবর্তীকালে তালেবানের আমেরিকা বিরোধী হয়ে যাওয়া…।
গান্ধিজি খেলাফত আন্দোলনের মত সাম্প্রদায়িক, মধ্যযুগীয় ধর্মীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার মত অগণতান্ত্রিক একটি আন্দোলনের সঙ্গে তার অসহযোগ আন্দোলনকে একাত্ব ঘোষণা ছিল ভারতবর্ষের জন্য এক বিরাট ভুল। বস্তুত এর মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যত দেশভাগের রাস্তাকে খুলে দিয়েছিলেন। কোন মুক্তি সংগ্রাম যখন ধর্মীয় বিভাজনের আর্দশে পরিচালিত হয় তাকে সমর্থন করার মানে হচ্ছে ভবিষ্যত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন করা।
স্বাধীনতা কিংবা সায়ত্ত্বশাসনকে সমর্থন করতে হলে কোন ধর্মীয় চেহারার আন্দোলনকে সমর্থন করতে হয় না। কাশ্মিরীদের হয়ে যখন সেখানকার মসজিদের ইমাম মুখপাত্র হয়ে কথা বলেন তখন সেটা আতংকের কথা। বেলুচিস্তান যদি স্বাধীন হয়ে আরেকটা ছোটখাটো পাকিস্তান কিংবা আফগানস্তান হয় তাহলে একজন সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমর্থক হয়ে সেটা ভাল লাগার কথা নয়। যারা ধর্মীয় পরিচয়ে বিশেষ অনুসারীদের হাতে শাসন ক্ষমতা রেখে বাকীদের তাদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে- এরকম বর্বর শাসন ব্যবস্থা ইংরেজদের হটিয়ে যারা ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাদেরকে বলতে হবে স্বাধীনতা সংগ্রামী? কাদের স্বাধীন করতে চেয়েছিল তারা?
ভাবতে বিভিষিকার মত লাগে যে, কিছু মানুষের হাতে গোটা পৃথিবীর ক্ষমতা চলে গেলে তারা মানুষের শিক্ষা, সম্মান, ক্ষমতায়ন একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে! কথার কথা, তিতুমীর কিংবা ১৯১৯ সালে খেলাফত আন্দোলনকারীদের মনোবাঞ্ছনা পূরন হলে এই ভূখন্ডের একটা বিপুল মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে বসবাস করতে হতো? কোন সুশীলতার ধার ধারি না, পৃথিবীর যে কোন রাজনৈতিক ও মুক্তি সংগ্রামকে আমি সমর্থন করবো একটা শর্তেই, তাকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী হতে হবে। পৃথিবীতে আমরা আর কোন ধর্মরাষ্ট্র চাই না। চাই গণতান্ত্রিক উদার অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র।

No comments:
Post a Comment