Friday, 15 January 2016

বাংলাদেশের দূষিত রাজনীতি

এদেশে বাস ভর্তি মানুষকে পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়! যাদের পুড়িয়ে মারা হয় তাদের কোন অপরাধ নেই। কি আশ্চর্য একটা ব্যাপার! জাতিগত দাঙ্গা হয় দুনিয়া জুড়েই। সেই দাঙ্গায় যাদের হত্যা করা হয় তারাও নিরপরাধীই থাকে তবু একটা কারণ থাকে যে তারা অমুক জাতি- এটাই তাদের অপরাধ। রাজনৈতিক মত পার্থক্য থেকেও প্রচুর খুনোখুনি হয়। যেমন- ওরা অমুক পার্টি করে, ওরা অমুক পার্টির কর্মী- এই পরিচয়টুকু ধরেও মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বাস, ট্যাক্সিতে, অটরিক্সায় যে মানুষগুলোকে পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় তাদের এরকম কোন যোগসূত্র পর্যন্ত নেই! তারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে, চিকিৎসার জন্য, স্কুল-কলেজে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়, তারা বড় জোর ভোটার, যে ভোটটা হয় সরকার দলীয় অথবা অপজিশন পার্টির, কিন্তু যারা আগুন দিয়েছে তাদের গায়ে তারা তো সেটাও জানে না। 

ছিনতাইকারীর হাতেও মানুষ প্রাণ হারায়। সেখানেও একটা কারণ নিহিত থাকে। পকেটে টাকা-পয়সা, মোবাইল বহনই ভিটটিমের অপরাধ। কিন্তু পেট্রলবোমায় যাদের দেহ ঝলসে গেছে তাদের এই অপরাধটিও ছিল না। কেননা তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার জন্য কেউ পেট্রলবোমা মারেনি। এরকম নিরপরাধ, সংজ্ঞাহীন হত্যাকান্ড দুনিয়ার আর কোথাও ঘটে না। এই বাংলাদেশ কেমন করে দুনিয়ার কাছে মুখ দেখায়? কেমন করে আফ্রিকার গ্রহযুদ্ধ কবলিত দেশগুলোতে “শান্তি মিশনে” নাম লেখায়?

গোটা ব্যাপারটা যেন আমরা প্র্যাকটিস করছি অভ্যস্ত হতে! এসব নিয়ে এখন আর লোকজন আলোচনা পর্যন্ত করে না। ঢাকা শহরে মালিবাগে একটি বাসে আগুন দেয়া হবে এটি কয়েকজন ওয়ার্ড পর্যায়ের কমী ঠিক করে দেয়- এরকম চিন্তা করাটা বড় রকম আহাম্মকি। আমি কোন রকম দলীয় বিতর্কে না যেয়ে বলতে চাই, যে দল অতীতে এবং এখন যারা করছেন, এটা একদম সর্বচ্চ পর্যায় থেকে কমান্ডটা চলে আসে। যেমন প্রধান সর্দার উপসর্দারকে ডেকে ভর্ৎসনা করে বলেন, হরতাল হয় না কেন? কি করেন আপনারা? উপসর্দার পাতি সর্দারকে ডেকে আলটিমেটাম দিয়ে বললেন, যেভাবে হোক কাল হরতাল সফল করবেন, কিভাবে করবেন জানি না। পাতি সর্দার এবার তার এড়িয়া সর্দারকে ডেকে বললেন, কি হরতাল ডাকেন যে লোকজন পাত্তাই দেয় না? কি করেন আপনারা? 

কেন্দ্রে মুখ দেখাতে পারি না! লোকজন হরতালকে পাত্তা দেয় না। কাজ করতে পারলে করেন নাইলে পদ ছেড়ে দেন! এড়িয়া সর্দার অপমানে এবার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ এড়িয়া সর্দারকে ডেকে গালাগালি করতে থাকেন, মিয়া কি ফালাও! তোমার এড়িয়া সকালবেলা দেখলে মনে হয় দেশে কোন হরতাল নাই। ঘরের মধ্যে বইয়া থাকলে রাজনীতি ছাইড়া দাও। কি করবা জানি না, পাবলিকরে ডর দেহাও। হরতাল খুব কড়া হবে এটা পাবলিককে আগে থেকে বুঝাও! পোলাপানরে কাজে লাগাও! এবার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণের এড়িয়া সর্দাররা তাদের এড়িয়ার মহল্লা সর্দারদের পার্টি অফিসে ডেকে বিস্তর গালাগালি করে। আরে ব্যাটা আজকাল বিয়া বাড়িতেও ককটেল ফোটে! দুই-চারইটা গাড়ি না পুড়াইলে পাবলিক বুঝবো হরতাল দিছি!... 

এড়িয়া সর্দাররা বুঝে নেয় কি করতে হবে। গাড়িতে আগুন দেয়ার লোকই আলাদা। এই পোড়ানোর জন্য একটা খরচাপাতি আছে। খরচাপাতি দিবে “গৌরী সেন”! ৫-১০ হাজার টাকায় একটা গাড়ি পুড়বে। গাড়ির ভেতর মানুষ থাকবে। গাড়ি থেকে পাবলিককে নামিয়ে গাড়িতে আগুন দেয়া যায়। কিন্তু দুই-চারটা পাবলিক না পুড়লে লোকজন ভয় পাবে না। লোকজন যখন হরতালের নাম শুনলেই ভয়ে কর্মস্থলে যাবে না, নিতান্তই দায়ে না পরলে পথে বেরুবে না তখনই “হরতাল সফল” হবে!...

ঠিক এরকমটাই চান একদম প্রধান সর্দার। তিনি চান হরতালে পাবলিক ঘরে বসে থেকে হরতালকে সফল করবে। এখন পারলকিকে ঘরে বসিয়ে রাখার জন্য কি কি করতে হবে সেটা তিনি জানেন না। সব কিছুই যদি তাকে বলে দিতে হয় তাহলে বাকীরা আছেন কেন? সব কিছু তাকে ভেঙ্গে বলতে হবে?

নাহ্, সর্দারের চোখের ভাষা যদি না-ই বুঝতে পারলেন তো রাজনীতি করতে আসছেন কেন? হারতাল সফল করতে হবে। সেই হরতালের উপর ভর করেই নির্বাচনের বৈতরনী পার হতে হবে। এতে দু-চারটা মানুষ পুড়ে মরলে কিছু হয় না। তাতে ফেইসবুকে হ্যাশ-ট্যাগের জিহাদ হয় না। হলেও কিছু যায় আসে না…।

No comments:

Post a Comment