Saturday, 9 January 2016

হতভাগা মুসলিম

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন আমাকে কখনই তেমন আকর্ষণ করেনি। কারণটা হচ্ছে এর হৈ-হল্লাটা। কখনো কখনো এটা এমন বাড়াবাড়ি আকার ধারন করে যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়ে। এ বছরও দেখবেন নববর্ষের প্রথমদিনে এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের নানা রকম দূঘটনার দু:খজনক খবর আসছে সারা দুনিয়া থেকে। সারা দুনিয়ার মত বাংলাদেশেও পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত থাকবে “উদযাপনকে নিয়ন্ত্রণ” করতে। এটা তো “ইসলামিক কান্ট্রি” তাই এই দেশে “মদ খাওয়া নিষেধ”। হিন্দু ছেলেদের কালিপূজায় মদ খাওয়ার একটা ফ্রি লাইসেন্স থাকে, মুসলিমরা জন্ম থেকেই হতভাগ্য। এদের জীবনে কোন উৎসব নেই। ইংরেজি নববর্ষ এদের কাছে “খ্রিস্টান কালচার”। বাংলা নববর্ষ নিয়েও এই রামগড়ুর ছানাদের দ্বিধাদ্বন্ড- বেদাত, হিন্দুয়ানী কিনা! তবে ঢাকার বারগুলোতে গেলে টেবিলে টেবিলে যে লোকগুলোকে বসে বসে পান করতে দেখা যায় তারা নিশ্চয় সবাই হিন্দু না। এদেশে মদ বেচার ও খাওয়ার লাইসেন্স কোন “মুসলমানকে” দেয়া হয় না। সারা দুনিয়ার মুসলমানই মদের পাগল। কিন্তু মুখে তারাই মদের বিরুদ্ধে জিহাদ তুলে! মুসলিমরা আর সব সম্প্রদায়ের মতই ভাল-মন্দের দোসর, তবু তাদের রক্ষণশীলতার বাড়িবাড়ি তাদেরই পায়ে শৃঙ্খল পড়ায়।…

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের নববর্ষ আসলে গোটা বিশ্ববাসীর। এটা আর ইংরেজ বা ইউরোপীয়ানদের নয়। উপনিবেশিক কাল পেরিয়ে আসার পর আমাদের মন-মানসিকতা সেকেল কিছু গোড়ামি থেকে যাবার পরও আমরা একটা “বৈশ্বিক সংস্কৃতির” চর্চা করতে সমর্থ হয়েছি। যেমন গোটা বিশ্বের মানুষের পোশাক এখন এক ও অভিন্ন। শিষ্টচারগুলোও প্রায় অভিন্ন। এর সবগুলোই এসেছিল ইংরেজ উপনিবেশিক যুগ থেকে ইংরেজদের হাত ধরে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার আজ আমাদের সবার ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডার আমাদের জন্ম-মৃত্যু থেকে শুরু করে সমস্ত ইহজগতের হিসাব-নিকাষের একমাত্র অবলম্বণ। কাজেই এই ক্যালেন্ডার আজ আমাদের সবার। এই ক্যালেন্ডারের নববর্ষ উদযাপন আমরাও তাই বিশ্ববাসীর সঙ্গে একই সঙ্গে পালন করবো। এর মধ্যে “বিজাতীয় কালচার” বলে ফালতু সেন্টিমেন্ট আনা হাস্যকর। মানুষের জীবনে যেখানে প্রতিনিয়ত যান্ত্রীক হয়ে যাচ্ছে সেখানে এই সেক্যুলার উদযাপনগুলো নির্দোষ বিনোদন আমাদের জন্য। মুসল্লি টাইপের লোকগুলো সব কিছুতেই বেদাত, খ্রিস্টানী কালচার বলে মানুষকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চায়। এমনকি বাঙালীদের নববর্ষকেও তারা বিষ নজরে দেখে থাকে। এর একটা খারাপ প্রভাব জাতীয় জীবনেও আমরা দেথে খাকি।

ইংরেজি নববর্ষের অুনষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ সময় হোন্ডা-গুন্ডার কারণে বিষাদের কারণ হয়ে উঠে। বাংলা নববর্ষের প্রভাতের যে অনুষ্ঠান, বর্ষবরণের যে সৌন্দর্য তার সামনে থার্টিফাস্ট নাইট কিছুই না। ইসলামী মৌলবাদীদের ভয় ছাড়া ঢাকায় সেদিন শুধু গান আর গান। যেখানেই যাও শুধু প্রাণ ভরে গান শুনো। আর আছে গোটা দেশ জুড়ে বৈশাখী মেলা! কিন্তু থার্টি ফাস্ট নাইটে সবপরিপারে খোলা রাস্তায় পালন করা খুব রিস্ক। নিরাপত্তাহীনতাই একমাত্র কারণ। মাতাল, গুন্ডা, পুলিশ, বখাটের উৎপাত বেশির ভাগ মানুষকে গৃহবন্দি করে রাখে। এইদিনে অভিজাত হোটেলগুলোতে যে আয়োজন হয় তার বেশির ভাগই উগ্র। এইসব অনুষ্ঠানের যোগ দেয়া লোকজনগুলোই পরবর্তীতে পরম ধার্মীক হয়ে উঠে। তাদের কাছে এই অনুষ্ঠানগুলো পরবতীকালে “খিস্টানী ক্যালচার” হয়ে উঠবে। কারণ হচ্ছে তাদের উদযাপনা কখনোই “সুস্থ” ছিল না। বৈশাখী মেলার নামে যদি গ্রমে-গঞ্জে উলঙ্গ নারী নৃত্যর আয়োজন চলে- আর সেটা যারা দেখতে যান- তাদের কাছেও শেষ পর্যন্ত বৈশাখী মেলাটা “বেদাত” হয়ে উঠে।…

No comments:

Post a Comment