এটা একটা বিরাট স্বস্তির বিষয় যে বাংলাদেশী ব্যান্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় যে শিল্পী ভারত বিদ্বেষীর অভিযোগ উঠিয়েছেন তার নাম ‘রূপম ইসলাম’, ‘রূপম গাঙ্গুলী’ হলেই মাইলস ও তার ভক্তরা এক সুরে গাইতে পারত, ‘হিন্দুরা আসলে মুসলমানদের ভাল দেখতে পারে না’! আফসোস তাদের জন্য, এক্ষেত্রে রূপম ইসলাম তার দেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য দায়ী করেছেন বাংলাদেশী ব্যান্ড মাইলসকে। মাইলস সেই ঘৃণা প্রকাশকে তাদের ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে দাবী করেছেন। বলেছেন, ‘আমার দেশের ক্ষতি হয় এমন বিষয় নিয়ে আমি কথা বলতে চাইতেই পারি, সে অধিকারও আমার আছে’।…
ক্রিকেট খেলায় হারলে কি করে দেশের ‘ক্ষতি’ হয় এবং সেটা কি করে দেশপ্রেম গোছের কিছু দাঁড়ায় সেটা মাইলস কেন কোন বাংলাদেশীকেই বুঝানো যাবে না। বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালে গোটা দেশের মানুষ যেভাবে প্রচন্ড ঘৃণা ছড়িয়েছিল সেকথা তো এখনো ভোলার নয়। আমরা গুটি কয়েক মানুষ তখন এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিস্তর গালাগালি খেয়েছি, এখনো খাই, আজকেও খাবো…।
বাংলাদেশের সব স্তরের সেলেব্রেটিদের চেহারা তখন ফুটে বেরিয়েছিল। তাদের ‘হিন্দু বিদ্বেষের’ নমুনা ফুটে বেরিযেছিল ‘দাদাবাবু-ধুতি’ ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার করে। রেডিওতে সুবর্ণা মুস্তফা থেকে শুরু করে টেলিভিশনে মুস্তফা ফারুকী, ইরেশ জাকের থেকে ছোট-বড় সেলেব্রেটিরা তাদের উপস্থিতি দিয়ে এমন একটা পরিবেশ, তাদের মন্তব্য দিয়ে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন মনে হয়েছিল, এই খেলা নিয়ে না দুই দেশের মধ্যে কুটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। কতখানি ঘৃণা আর বিদ্বেষ মনে লুকিয়ে রাখলে দেশপ্রেমের আড়ালে এই বিদ্বেষ প্রকাশ পায় সহজে অনুমেয়।
কোলকাতার কিছু সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশী ক্রিকেট নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বনাম বাংলাদেশের সেলেব্রেটিদের ভারত বিদ্বেষ! অল ইন্ডিয়া তো বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথা বলেনি। বিষয়টা সম্ভবত তারা জানেই না। পশ্চিমবাংলা বাঙালীদের প্রদেশ বলে এখানকার বাংলাদেশীদের ঘৃণা ছড়ানো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলো পড়ে জানতে পারে। কোলকাতার অভিনেতা পরমব্রত দুই বাংলার ক্রিকেট কেন্দ্র করে যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিল তা নিয়ে চমৎকার একটি লেখা প্রকাশিত করেছিল। বলাই বাহুল্য, কোন বাংলাদেশী দেশপ্রেমিকের তাতে মন এতটুকু ছুঁতে পারেনি।
এককভাবে মাইলসকে চিহিৃত করতে আমি রাজি নই। কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী ফিরোজা বেগম ও অমর সুরকার কমল দাস গুপ্তার ছেলেরা কেন ভারত বিরোধী, হিন্দু বিদ্বেষী সেই গবেষণার ফল ভিন্ন কিছু বের হবে না, গোটা বাঙালী মুসলমানের এক ও অভিন্ন দ্বি-জাতি তত্ত্বই তাদের বিদ্বেষের কারণ। ক্রিকেট খেলা নিয়ে বাংলাদেশীরা প্রচন্ড ঘৃণার বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়েছে এই সত্যকে খোদ শাফিন-হামিনও অস্বীকার করতে পারেনি।
তারা দাবী করেছে এটাই তাদের ‘দেশপ্রেম’! মিথ্য বলেনি অবশ্য। সেই ৪৭ সাল থেকে প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে আমাদের যে পথচলা তারই পোশাকি নাম ‘দেশপ্রেম’। পাকিস্তানীরা বাঙালী মুসলমানদের জারজ বলেছে। সৌদিরা বাংলাদেশী মুসলমানদের ‘মিসকিন’ বলে ডাকে। তাতে তো কোন বাংলাদেশী মুসলমানের এই দুটি দেশের প্রতি সহানুভূতি কমতে দেখি না। ভারত নাকি আমাদের ‘হেয়’ করে। নিশ্চয় ভারত সাকিব আল হাসানকে ‘হেয়’ করেনি? জেমসকে ‘হেয়’ করেনি? শাহ আবদুল করিমকে ‘হেয়’ করেনি? হুমায়ূন আহমেদকে ‘হেয়’ করেনি?
বাংলাদেশে ভারত বিরোধীতা যেমন ধর্ম মূখ্য ভূমিকা রাখে, তেমনি পাকিস্তান প্রেমও ধর্ম মুখ্য ভূমিকা রাখে- এটাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। দুই লাখ নারীকে ধর্ষণ করার ঘটনা ভুলতে যেখানে আমাদের লেগেছিল তিন বছর (৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভূট্ট’র বাংলাদেশ সফরে ঢাকার রাস্তায় জনতা তাকে উচ্ছ্বসিত শুভেচ্ছা জানায়) সেখানে ফালানী, ফারাক্কা ইস্যুতে ঢাকার গ্যালারিতে ‘মালাউনের বাচ্চা, তর মায়রে… তর বইনেরে…’ বলে স্রেফ ‘দেশপ্রেমের’ কারণে- এরকম হাস্যকর যুক্তিই দিচ্ছে মাইলস! ক্রিকেট চলাকালে তাদের হেইট ইস্পিচগুলো নাকি তাদের ‘দেশপ্রেম’!

No comments:
Post a Comment