Friday, 11 March 2016

বাংলাদেশের রাজনীতি ও ধর্ম

ঘোষেটি বেগম প্রসাদ ষড়যন্ত্র এইবার ব্যর্থ হলেও আশাহত হবার কারণ দেখি না। তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বলই মনে হচ্ছে। হতাশার কথা লিখতে চাইনি, কিন্তু যা বিশ্বাস করি তা লিখতেই হবে, উপায় নেই…।

আওয়ামী লীগ যদি উন্নয়ন দিয়ে পুরো দেশও ভরে ফেলে তবু একটা পক্ষপাতহীন নির্বাচনে ভয়ংকর ভরাডুবি তারা এড়াতে পারবে না। কারণ আওয়ামী লীগের গায়ে “ধর্মনিরপেক্ষতা” বলে একটা তকমা লাগানো আছে। এদেশের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতা চায় না। দুনিয়ার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমই তা চায় না। আওয়ামী লীগ এখন ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে বহুদূর দিয়ে হাঁটে। তবু “দুর্নাম” যেন ঘুচবার নয়! এই দলটি এখন ডানপন্থির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। না যেয়ে উপায়ও নেই। তারাও জানে দেশের মানুষ ইসলাম চায়। তারা ইসলামী ভাবাপন্ন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। অদ্ভূত কারণে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠি আওয়ামী লীগকে ইসলাম বিরোধী বলে মনে করে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা বংশক্রমে আওয়ামী সমর্থক, তারাও দলকে ইসলামী ধ্যান-ধারনায় দেখতে চায়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এখন তাতে আপত্তি নেই। তবু আওয়ামী বিরোধী ভোট বেড়েই চলেছে।

গভীর কারণটা হচ্ছে পাকিস্তানকে ভাঙ্গা। পাকিস্তান একটা ইসলামী রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে বাংলাদেশ নামে একটা ধর্মনিরপেক্ষ (হোক কাগুজে) রাষ্ট্র হওয়া তো সহজে হজম হবার নয়। আজকে যতই শেখ মুজিবকে “তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি” বলে ইতিহাস রচনা করা হোক না কেন, তিনিই যে পাকিস্তার ভাঙ্গার মূল হোতা সেটা পাকিস্তান প্রেমিদের অজানা নয়। সেই থেকে তাদের চোখে আওয়ামী লীগ ইসলামী কওমের শত্রু। 

তারা উপমহাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার শত্রু। ৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগকে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে সামরিক শসনের কারণে। এই ২১ বছর পর ১৯৯১ সালে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারতে হয়েছিল “মুসলিম জাতীয়তাবাদের” জোর জোয়ারে কাছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ইন্ডিয়া বাংলাদেশকে দখল করে ফেলবে, হিন্দুস্তানী শাসন কায়েম হবে- খালেদা জিয়ার এই প্রচরণার কাছে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে হেরে যান। সেই থেকে আওয়ামী লীগের বদলে যাবার লক্ষণীয় উদ্যোগ। 

আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতাদের টুপি- নামাজ-রোজা-হজ পালনকে প্রচার করার শুরু। আওয়ামী লীগের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, বই সর্বত্র জয় বাংলা আর জয় বঙ্গবন্ধুর মাঝখানে “আল্লাহো আকরব” বা “বিসমিল্লাহ” লেখার অলিথিত নীতি গ্রহণ। শেখ হাসিনা খালেদার জিয়া যেমন সমস্ত কিছুতে বিসমিল্লাহ বলার পাবলিক দেখানো কৌশল, সেই অনুকরণে পরম করুনাময় আল্লাহ নামে শুরু করছি”- বলে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীর উদ্বেধনও শুরু করে দিলেন। ৯৬ সালের নির্বাচনের আগে নামাজরত শেখ হাসিনার পোস্টার ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগ প্রচার করে তাদের “হিন্দুত্ব” “ইসলাম বিরোধী” “র্দুনাম” ঘুচাতে। ৯৬ সালে বিএনপির দুশাসনে অতিষ্ঠ জনগণ আওয়ামী লীগের “একবার দেশ শাসনের সুযোগ” বলে কাকুতি-মিনতি ২১ বছর পর তাদের দেশ শাসনের ষুযোগ করে দেয়। তারা ভুলেও ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, জাতীয় কিছু তাদের প্রচারণায় রাখেনি। 

কারণ তারা ততদিনে জেনে গেছে এদেশের ধর্ম প্রিয়, ইসলাম প্রিয় জনগণ এসব শুনলে সন্দেহের চোখে তাকাবে। ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া ফের জগগণের ইসলামনুভূতিতে সুরসুরি দিতে সক্ষম হন। তিনি ও তার দল প্রকাশ্যে বলতে থাকে আপনারা কি কুরআনের শাসন চান নাকি গীতার? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজান নয়, উলু ধ্বনি শোনা যাবে। ইন্ডিয়া বাংলাদেশের অর্ধেক নিয়ে নিবে ইত্যাদি ইত্যাদি…। ফলাফল হাতেনাতে। অতিসাম্প্রতিককালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে আবারো বিএনপি-জামাতের অতিষ্ঠ, সীমাহীন দূনীতি, তারেক জিয়ার মাফিয়া শাসনের বিপরীতে। যদিও তখন আমরা বলেছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গিকার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। এই বিশ্লেষণ যে ভুল ছিল সেটা সাঈদী-গোলাম আযমদের বিচার নিয়ে জনগণের মনোভাব প্রমাণ করেছে। আসলে বিএনপি-জামাত, ফখরুদ্দি-মঈউদ্দিনদের শাসন আওয়ামী লীগকে ওয়াকভার দিয়ে দেয়। 

আওয়ামী লীগ সেক্যুলার চরিত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের কোন প্রতিশ্রুতি ভুলেও উচ্চারণ করেনি। দেশের মানুষের খুবই অল্প একটা অংশ আসলে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। সেটা প্রমাণ হয়েছে শাপলাচত্তরের হেফাজতের উত্থান। কথিত “আলেম হত্যার” অভিযোগে এরপর অনুষ্ঠিত চার সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয় যা জনগণের চরম অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। ঐ চার সিটির মেয়র যারা আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন তারা স্মরণকালের রেকর্ড উন্নয়ন করেও ফেল করেন! সিটিগুলোর মানুষ স্বীকার করেছে প্রার্থীরা তাদের দায়িত্ব শতভাগ পালন করেছেন তাদের প্রত্যাশার চেয়ও বেশি। কিন্তু “আলেম হত্যাকারী” ইসলামের শত্রু জালেম আওয়ামী লীগের শাসন তারা চান না। 

আসলে এদেশের মুসলমান জনসাধারণ না খেয়ে থাকবে তবু তারা ইসলামকে চায়। তাদের কাছে উন্নয়ন তুচ্ছ এইসব আলেম-ওলামাদের বিনিময়ে। আওয়ামী লীগ ভাল করেই জানে তাদের বিরুদ্ধে এদেশে কি রকম নেতিবাচক প্রচারণা চলে। তারা তাই ইসলামের বন্ধু সাজতে নাস্তিক লেখক-ব্লগারদের একহাত নিতে বাধ্য হয়। মদিনা সনদের অধিনে দেশ শাসনের অঙ্গিকার করে। ইসলামের খেদমতে বঙ্গবন্ধু কতখানি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন সেটাই এখন বঙ্গবন্ধুর একমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়! এসব প্রচার প্রচারণা না করে আওয়ামী লীগের কোন উপায়ও নেই। 

আওয়ামী লীগকে এদেশে রাজনীতি করতে হলে পুরোপুরি ডানপন্ধি হতে হবে। মুসলমানদের অন্তত সমসাময়িক বিশ্বে কোথাও নজির নেই যেখানে তারা উদার, সেক্যুলারবাদীদের তারা সমর্থন জানিয়েছে। মুসলিমরা এখন শরিয়া চায়। তারা হাতকাটা, গলাকাটার শাসন চায়। ধর্ষণের কারণ হিসেবে তারা বোরখা তথা পর্দাহীনতাকে দায়ী মনে করে। কুরআন-হাদিস বিরোধী কোন আইন তারা বরদাস্ত করবে না। ট্রেজিডি হচ্ছে এই হাওয়ায় পাল খাটিয়েও মনে হয় না আওয়ামী লীগ পার পাবে। তার কারণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় আওয়ামী লীগের। এদেশের আলেম-ওলামারা এ জন্য কোনদিন আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করবে না। জনগণ আলেম-ওলামাদের কথাই শুনবে। 

নারী নেতৃত্ব হারাম এটা তারা ওয়াজে বলতে বলতে এদেশের জনগণকে একদিন পুরোপুরি মানতে বাধ্য করবে। ধর্মনিরপেক্ষা হারাম, গণতন্ত্র হারাম, সেক্যুলারত্ব মানে নাস্তিকতা-এসব বিষয়ে এখন সমস্ত মুসলিমরা একমত। যারা এখনো এসব জেনেও নারী নেতৃত্ব পিছনে আছে তারা ধর্মকে পাশ কাটাচ্ছে। বাংলাদেশের মত মুসিলম অধ্যুষিত দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা সবসময়ই হুমকির মুখে। ভিন্নধর্মালম্বিদের পক্ষে কথা বলার রিস্কও কোন রাজনৈতিক দল নিতে চাইবে না দিনকে দিন। হিন্দু জনসাধারণ কমতে কমতে এক সময় শূন্যে নেমে আসবে। ভিন্ন জাতিসত্ত্বাগুলোও “মুসলিম-বাঙালী” যৌথ জোশে দেশান্তরীন হতে বাধ্য হবে। তখনো কিছু “সংখ্যালঘু” হয়ত অবশিষ্ঠ থাকবে দেশে- তারা নাস্তিক, অসাম্প্রদায়িক মানুষ। আর নাস্তিক হত্যা করা তো ওয়াজিবই! …

No comments:

Post a Comment