কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমর্থন করা আমাদের প্রগতিশীলদের এক ধরণের দায় থাকে। সে দায়টা প্রগতিশীলতারই। এই অঞ্চলের প্রগতিশীলতার চর্চার মুনিষিদের প্রায় সবাই কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, নিদেন পক্ষে বামঘেষা ছিলেন। অথচ সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন জানালে আরো দশটা ‘বাদকে’ সশস্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করা যায় না।
পৃথিবীর সবচেয়ে মানবহিতকর মতবাদও যদি প্রতিষ্ঠা করতে একজন মানুষের রক্তের প্রয়োজন পড়ে তো সেটা বাতিলযোগ্য। পৃথিবীতে সব মানুষ একটি বিষয়ে একমত হবে না কাজেই কোন মতবাদ কায়েম বা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মাত্রই প্রতিক্রিয়াশীলতা। সভ্যতার বিনির্মানকালে একেকটা বিপ্লব প্রয়োজনীয় ছিল, এমন কি সভ্যতার আদিতে ধর্মেরও একটা উপযোগিতা ছিল, কিন্তু আজকের যুগে ব্যক্তি স্বাধীনতাই সব মতবাদের ভিত্তিভূমি না হলে অচল। এ জন্যই গণতন্ত্রই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর শেষকথা।
‘বাংলাদেশী জিহাদ’ ঠিক যেন নকশাল আন্দোলনের মত রূপ পেয়েছে। এই ছেলেগুলো যদি ইসলামিস্ট না হয়ে বাম বিপ্লবী হতো তাহলে কি আমরা তাদের সমর্থন দিতাম? সিরাজ শিকদারকে তো আজো কেউ কেউ বিপ্লবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সমরেশ মজুমদার নকশালদের জন্য দরদী উপন্যাস লিখেছিলেন ‘কালবেলা’। এখন যদি জাকির তালুকদারদের মত কেউ এইসব আনসারুল্লাহ-জেএমবিদের মত জিহাদীদের নিয়ে কালবেলার অনুরূপ সহানুভূতিমাখা উপন্যাস লেখে? কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের প্রচুর পড়াশোনা, জ্ঞান-বুদ্ধি আর পান্ডিত্বতা কি তাদের খুনোখুনিকে সাফাই দেয়? নকশাল আন্দোলনকারীরা রবীন্দ্রনাথের মূর্তি ভেঙ্গেছে, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙ্গেছে- তাদের কাছে বুর্জোয়া মানেই পরিত্যাক্ত।
ধনী ঘরের আদরের দুলালরা সব ঘরে ছেড়ে ‘শ্রেণীহীন সমাজ’ গড়তে ‘শ্রেণীশত্রুদের’ গলা কাটতে বেরিয়ে পড়েছিল। তারপর এই অরাজকতা থামাতে রাষ্ট্র নিমর্ম অত্যাচার চালিয়েছিল। কেউ কেউ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল, পাগল পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। আর পুলিশের হাতে মরেছিল অকাতরে…। অথচ এই নকশারা যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল সেখানে আমাদের কোন বাক স্বাধীনতা থাকত? আমার ভাবনা-চিন্তাকে পর্যন্ত এরা সেন্সর করতে চাইত।
সিরাজ শিকদার থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তারুণ্য। আদর্শ উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুতে চলে গেছে কিন্তু পন্থা সেই একই ঘৃণা আর সন্ত্রাস…। বন্দুকের নলে ক্ষমতার উৎস থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু সেটা গণতন্ত্রের পথ নয়। মানুষ কখনই একটি বিষয়ে একমত হতে পারে না- মানুষের এই প্রকৃতিগত বৈশিষ্ঠকে অস্বীকার করে বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে প্রথমেই তাই মানুষের মুখকে বন্ধ করতে লাগে। এই ভিন্নমতের মুখ বন্ধ করতে, ভিন্ন দর্শন আর ভিন্ন বিশ্বাসকে যারা দমন করার অঙ্গিকার করে তাদের সকলকেই পরিত্যাগ করা উচিত। গোটা পৃথিবীর যা বয়েস আর সভ্যতার এখন যে পরিণতি, এখন আর কোন অনুসারী রাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক সমাজকে প্রতিষ্ঠাই একমাত্র বিপ্লব হতে হবে- বিপ্লব হবে বুদ্ধিভিত্তিক, অস্ত্র নয়।
দুদিন আগে চে’র টি-শার্ট যাদের গায়ে ছিল তারাই আজ কালো পাঞ্জাবী পড়ে জিহাদী হয়েছে। নাহ্, চে’কে আমি কখনই আমাদের তারুণ্যের রোলমডেল হতে ইচ্ছা করিনি। লালন ছিল আমাদের হাতের কাছে। আমরা তার জীবনমুখি গানকে তারুণ্যের দর্শন করতে পারিনি। …এমন মানব জনম আর কি হবে, মন যা কর তড়ায় করো এই ভবে…। আমরা শুধু তাদেরকে মরতে শিখিয়েছি। জীবনের মুল্য বুঝাইনি। এত মৃত্যু, এত রক্ত তো আমরা দেখতে চাইনি। এ সবই আমাদের সহ্য করতে হবে…।
No comments:
Post a Comment